থানচিতে পাহাড়ের চূড়ায় ট্রি-প্লান্ট ভবন : কোটি টাকার প্রকল্প কাজে আসছে না
আকাশ মারমা মংসিং, বান্দরবান : প্রতিমৌসুমে পানির জন্য হাহাকার থাকে পাহাড়ে বসবাসরত লক্ষাধিক মানুষ। তবে তীব্র আকারে ধারণ করে গ্রীষ্ম মৌসুমে। সেসব দুর্গম মানুষদের পানি সংকট থেকে রেহাই পেতে প্রতিবছর নেয়া হয় কোটি কোটি টাকার উন্নয়নের প্রকল্প। অথচ সেসব উন্নয়ন প্রকল্পটি দুর্নীতি আগ্রাসনে থমকে যায় নয়ত ফেলে রাখা হয় নানা অজুহাতে। বলছি দুর্গম উপজেলা থানচিতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কোটি টাকার প্রকল্পের কথা।
চার বছর আগে থানচি সদর ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষের জন্য সংকট নিরসনের পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ট্রি-প্লান্ট প্রকল্পটি নেয়া হয়। কিন্তু প্রকল্পটি দেখা গেলেও পাহাড়ের চুড়ায় পড়ে আছে কোটি টাকার সেই কাজটি। চালু হবে হচ্ছে এমন তালবাহানায় প্রতিদিন মাটি খুড়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা। তবুও সেই কয়েক কিলোমিটার দূরে ঝিড়ি থেকে পানি সংগ্রহ করে সারাদিনে জীবনযাত্রার মান চালিয়ে যাচ্ছে ওই এলাকার হাজারো মানুষ।
প্রত্যান্ত উপজেলা সদরে কয়েকটি গ্রামে মানুষের জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে ২০২১-২২ অর্থ বছরে ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্পটি নিয়েছিলেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। মি. ইউ টি মং স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজটি বাস্তবায়ন করেছিলেন ঠিকাদার আবুল কালাম সেন্টু ও চিংথোয়াই মারমা। শুরুতে কাজ কিছুটা এগোলেও পরবর্তীতে সেই প্রকপ্লের অগ্রগতি থমকে যায়। কিন্তু ঠিকাদাররা দেখাচ্ছে তিলকে তাল বানানোর অজুহাত।
অভিযোগ আছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম ও নিম্নমানের কাজের কারণে অধিকাংশ টিউবওয়েল, রিংওয়েল বা জিএফএস প্রকল্প শুষ্ক মৌসুমের আগেই অকেজো হয়ে পড়েছে। একই সাথে নির্মাণ করা ট্রি-প্লান্টের ভবনের নানা পাইপ লাইন কোথাও মরিচা আবার খুলে পড়ে আছে। গতানুগতিক ভাবে কাজটি না করে অনিয়ম ছোয়া থাকায় এখন শুধু ভবন ছাড়া আর কোন কিছু নাই।
উপজেলা টিএনটি পাড়া, ছাহদাক পাড়া, টুংটাং পাড়াসহ আশেপাশে আরো বেশ কয়েকটি পাড়া রয়েছে। সেসব গ্রামে প্রায় হাজারো মানুষের বসবাস। নিত্যদিনই প্রয়োজনীয় মেটাতে তাদের একমাত্র ভরসাস্থল খাবার পানি। কিন্তু প্রতিমৌসুমে পানি সংকট কারণে তারা প্রতিনিয়ত ব্যবহার করছে সেই ঝিড়ির পানি। যে পানি ময়লাযুক্ত ও যা দেহের জন্য ক্ষতিকারক। তবুও পানির তৃষ্ণাদগ্ধ মেটাতে সংগ্রহ করছেন সেসব খাবারে পানি। অথচ পাহাড়ের চূড়ায় ৩০ শতক জায়গায় পানি সংকট নিরসনে স্থাপন করা হয়েছিল ট্রি-প্লান্ট পানি সরবরাহ। পানি ত দুরের কথা শুধু চোখ মেললেই দেখা যায় জঞ্জাল মোড়ানো সেই কোটি টাকার ভবন ও পানির হাউজ।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা বাধ্য হয়ে ঝিরি, পাহাড়ি ঝর্ণা ও কূপের পানি ব্যবহার করছেন। অস্বাস্থ্যকর পানির কারণে নারী ও শিশুসহ বহু মানুষ পানি বাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। শুধু তাই নয় প্রতিনিয়ত লোকজন এসে বাড়ি কিনারাই মাটি খুড়ে আবার চলে যান। অথচ তারা পানি সংকট নিরসনের দুরের কথা কোন সুরাহা পাচ্ছেন না। দ্রুত প্রকল্প চালু করা না হলে শুষ্ক মৌসুমে সংকট আরও চরমে পৌঁছাবে বলে মনে করেছেন সেখানকার মানুষজন।
টিএন্ড টি পাড়া টুকটাঙ পাড়া মধ্যবর্তী স্থানে পাহাড়ে চুড়ায় স্থাপন করা হয়েছে ট্রি-প্লান্ট ভবন। সেখানে দেখা মিলে হাউজের ভিতর ময়লাযুক্ত পানি আর চারিপাশে জঙ্গল। পানি সরবারাহ করতে মাটি গর্ত করে পাইপ দিয়েছে গত একবছর ধরে। অথচ সে পাইপে না আসছে পানি না ছোয়া যাচ্ছে পানি স্পর্শ। যেসব লোহার তৈরী পাইপ জোড়ালো দেয়া হয়েছে সেগুলো মরিচা ধরে পড়ে আছে। ভবনের তালাবদ্ধ ও পরিচর্যা করার মতন কোন কর্মচারী নাই।
টিএন্ডটি ও টুংটাঙ পাড়ার বাসিন্দা রওশন বেগম, জাহানারা ও ক্রাপই ম্রো জানিয়েছে, বহু বছর ধরে তারা পানির সংকটে ভুগছেন। ঝর্ণা থেকে দূর-দূরান্তের পথ পাড়ি দিয়ে পানি আনতে হয়, যা বর্ষাকালে আরও কঠিন হয়ে পড়ে। পাহাড়ে নির্মিত পানির হাউস দেখে প্রথমে আশাবাদী হলেও বছর গড়িয়ে গেলেও তা এখনো চালু হয়নি। দ্রুত পানি সরবরাহ শুরু করার দাবি তাদের।
থানচি সদর ইউপি চেয়ারম্যান অংপ্রু ম্রো জানান, বহুমাস আগে শুনেছি পাহাড়ের উপরে পানি হাউজ তৈরী করেছে। কিন্তু পানি সরবরাহ এখনো চোখে পড়ে নাই। এভাবে টাকা নষ্ট হচ্ছে কিন্তু পানি সমস্যা সুরাহা এখনো পাচ্ছে না মানুষ।
ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে প্রকল্পের কাজ আটকে আছে বলে দাবি করেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে। তিনি বলেন,ভূমি-সংক্রান্ত সমস্যা সমাধান হলে দ্রুত প্রকল্পটি চালু করা হবে। এর বেশী কিছু তিনি বক্তব্যে দিতে অনীহা প্রকাশ করেন।






